নজরুলের কথা
II ১ II
নজরুলের কথা আজ এভাবে স্মরণ করতে হবে, সে কথা সুদূরতম কল্পনাতেও ভাবিনি। সাহিত্য-ইতিহাসের ছাত্র হিসাবে, যখন পূর্ব যুগে সংঘটিত সাহিত্যিকদের প্রতি অবিচারের কাহিনী পড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলাম, সেদিন ভাবিনি যে, আমাদের জীবদ্দশাতেই সাহিত্য-ইতিহাসের এক নিষ্ঠুরতম উদাসীনতার অসহায় সাক্ষীরূপে থাকতে হবে। মাইকেলের সমাধি স্তম্ভের পাশে দাঁড়িয়ে প্রথম জীবনে কতদিন ভেবেছি, সেদিন যদি আমি বেঁচে থাকতাম তাহ’লে সমগ্র বাংলাদেশের চেতনাকে জাগিয়ে তুলতাম, সেই নির্মম উদাসীনতার দিকে; কিন্তু আজ, সেই উদাসীনতারই পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে... সেই আমিও রয়েছি...কতটুকুই বা কি করতে পেরেছি বা পারি! নিজের অক্ষমতার দৈন্যে লজ্জিত হওয়া ছাড়া, বেশী কিছু আর কি করতে পারি?
II২II
কিন্তু ভাবি, কেন এই অসহায়তা? কোথায় যেন এর মধ্যে কি একটা মহৎ ত্রুটি সংগোপন অবস্থায় রয়েছে, যার জন্যে ব্যক্তিগত কোন চেষ্টাই ফলবতী হতে পারে না। অথবা ব্যক্তিগত দায়িত্বকে এড়াবার জন্যে এটা কোন আত্ম-প্রবঞ্চনারই রকমফের? নজরুলের সতীর্থ-বন্ধু সংখ্যা তো কম নয়। তাঁরা তো আজ সকলেই সাহিত্যক্ষেত্রে প্রথিতযশা ব্যক্তি।
কিন্তু বহু চেষ্টার ফলে, এই সমস্যার মূলের সন্ধান পেয়েছি। অতি সহজ সত্য এবং অতি সহজ বলেই তাকে খুঁজে বার করতে এত চেষ্টা করতে হয়। সত্যটা হলো এই, এ সমস্যা ব্যক্তিগত সমাধানের বিষয় নয়, এ সমস্যা নজরুলের আত্মীয় স্বজনের নয়, নজরুলের বন্ধু-বান্ধবের নয়, এ সমস্যা হলো সেই দেশের যে দেশের সন্তান, সে যে দেশকে সুন্দর করতে, স্বাধীন করতে সে রাত-প্রভাতের চরণের মত ঘুরে বেড়িয়েছে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে; এ সমস্যা হলো রাষ্ট্রের সমস্যা, যে রাষ্ট্র সভ্য মানুষের সমাজে মানবতাকে সম্মান করতে জন্মগ্রহণ করেছে, যে রাষ্ট্র পুরানো জগতের ভুলের সংশোধন করে নতুন মানুষের সামনে নতুন আদর্শকে তুলে ধরবে। এ হলো সাহিত্য ও রাষ্ট্রের সম্পর্কজনিত সমস্যা। যদি এ সমস্যার সমাধান না হয়, তাহ’লে বুঝতে হবে, আমাদের রাষ্ট্র এখনো সভ্যতার সে স্তরে এসে পৌঁছয়নি, যেখানে সাহিত্যকে সে তার যোগ্য মূল্য দিতে শিখেছে। সাহিত্যের সঙ্গে রাষ্ট্রের সে আত্মিক সম্পর্ক বাংলা দেশে গড়ে ওঠেনি, গড়ে ওঠবার কোন লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না; তাই আজ প্রত্যেক সাহিত্য-স্রষ্টার সমস্যা তার ব্যক্তিগত সমস্যা। রাজনীতি সাহিত্যকে এড়িয়ে আত্মসর্বস্বতার দম্ভে নিজেকে কতখানি রিক্ত করে তুলছে ভেতর থেকে, বাইরে তার স্ফীতোদর দেখে হয়ত বোঝা যায় না, কিন্তু একদিন তার মূল্য অতি নির্মমভাবেই দিতে হবে; যখন সামান্য একটা পিনের ফোটায় ফুলে ওঠা বেলুনের পেট ফেটে পড়ে যাবে, তখন চুপসে রাস্তার ধারে নর্দমায় তাকে পড়ে থাকতে হবে। তখন আবার ডাক পড়বে সাহিত্যিকের... জাগাও, মাতাও, বাণী দাও, দাও বাণী...
II ৩ II
বসেছি লিখতে নজরুলের স্মৃতি—বন্ধুর স্মৃতি। বড় বিচিত্র এর পরিবেশ। সে রয়েছে দু’হাত দূরে, আমি বলছি তার স্মৃতিকথা, ভুল হলে সে তা সংশোধন করবে না, ঠিক হলে সে তাতে আনন্দিত হবে না। তার মর্মর মূতির মতনই, সে রয়েছে আমার সামনে... এক অংশ তার চলে গিয়েছে ইতিহাসে....আর এক অংশ এখনও রয়েছে আমাদের সঙ্গে... ভালবাসার বাউল, কবি... আমাদের ভালবাসা আজ তার একমাত্র উপজীব্য।
II 8 II
বহুদূরে পেছনে চলে যায় দৃষ্টি। সব শেষ হয়েছে জগতের প্রথম মহাযুদ্ধ। একদল দুঃসাহসী বাঙালী ছেলে ঘর-বাড়ী ছেড়ে চলেছিল ফ্রান্সের দিকে, মেসোপটেমিয়ার দিকে; রাজা ইংরেজকে সাহায্য করবার কথাটাই তাদের মনের মধ্যে বড় হয়ে ছিল না, তাদের অধিকাংশের মনের মধ্যে ছিল বাঙালী ভাল ছেলের ভালমানুষের বদনামটুকু ঘোচাতে... খাওয়া-বসা-শোয়া আর কেরাণীগিরি করার বাইরে একটা কিছু করা...
বর্দ্ধমান থেকে এই দলে একটি তরুণ যুবা যোগদান করে... তার যৌবন জাগরণেব সঙ্গে সঙ্গেই তার মনে হয়েছিল, যে পরিবেশের মধ্যে সে জন্মগ্রহণ করেছে, সে যেন
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments